ঈদুল আজহা: মেীসুমী ব্যবসা

তারিকুল ইসলাম

আনুষ্ঠানিকতা ও আয়োজনের ব্যাপ্তি বিচার করলে মুসলিম সম্প্রদায়ের সব থেকে বড় ধর্মীয় উৎসব হচ্ছে ঈদুল আযহা। এই উৎসবকে ঘিরে উৎসাহের যেমন কমতি থাকে না, তেমনি একে ঘিরে তৈরি হয় এক বিরাট এলাহি-যজ্ঞ। ব্যবসায়ীদের সাথে পাল্লা দিয়ে নানান মৌসুমী ব্যবসায়ীকে উদিত হতে দেখা যায় এই সময়টায়। ঈদের মতো বিশাল আয়োজনের উৎসবে ব্যবসায় নেমে তারাও লাভের গুড় খানিকটা নিজের পকেটে ভরার আশায় থাকেন তৎপর।

মেীসুমি চামড়া ব্যবসায়ী
সাধারণত কোরবানির এই ঈদকে ঘিরে সব থেকে বেশি দেখা যায় মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের। এলাকার তরুণ-যুবারাই মূলত বাড়তি কিছু উপার্জনের আশায় এ ব্যবসায় নামেন। স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে তারা অল্প মূল্যে চামড়া সংগ্রহ করেন এলাকা থেকে, এরপর মধ্যসত্ত্বভোগী হয়ে পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে তুলনামূলক বেশি দামে চামড়া বেচেন।

দালাল ব্যবসা
হাটকেন্দ্রিক মৌসুমি ব্যবসাগুলোও থাকে বেশ জমজমাট। হাটের সব থেকে পরিচিত মৌসুমী ব্যবসাটি হচ্ছে দালাল ব্যবসা। বিক্রেতার সাথে চুক্তিবদ্ধ কোনো এক দালালই হয়তো আপনাকে উৎসাহী করে তুলবে নির্দিষ্ট সেই বিক্রেতার পশুটি কেনার জন্য। এরপর সে কেনা-বেচা থেকে লাভের একটা কমিশন চলে যাবে যথারীতি দালালটির পেটে।

সেবামূলক ব্যবসায়ী

  • হাট থেকে কোরবানির পশু ক্রেতার ঠিকানায় পৌঁছে দেবার জন্য রয়েছেন আরেকদল মৌসুমি ব্যবসায়ী।
  • দূর-দূরান্ত থেকে পশু নিয়ে আসা বিক্রেতাদের থাকা-খাওয়ার চাহিদা মেটাতেও হাটে থাকে অস্থায়ী নানা ব্যবস্থা। এদিকটাও কিন্তু মৌসুমী ব্যবসায়ীদের দ্বারাই পরিচালিত হয়।
  • পাশাপাশি কোরবানির পশুদের খাবার খৈল, ভূষি, ঘাস-পাতা নিয়ে হাটের কোনো এক কোণে ব্যস্ত সময় পার করে আরেক দল ব্যবসায়ী

 

কসাই সার্ভিস
শহুরে জীবনের নানান সংকটের আঁচ লেগেছে কোরবানির ঈদেও, ঈদ এলেই দেখা দিচ্ছে কসাইয়ের সংকট। চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল হওয়ায় ঈদের আগে কসাইয়ের ব্যবস্থা হওয়া যেন আকাশের চাঁদ হাতে পাবার মতোই ব্যাপার আজকালকার দিনে। এই তুমুল চাহিদার প্রেক্ষিতে উদ্ভব হয়েছে এক অভিনব মৌসুমি ব্যবসার – কসাই সার্ভিস। নির্মাণ ঠিকাদারদের কায়দায় এই “কসাই ঠিকাদার”রা তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। অর্থের বিনিময়ে তারা আপনাকে নিশ্চিন্ত রাখবে গোশত কাটাকাটির ব্যাপারে, কসাই সার্ভিস দিয়ে।

মশলা সিন্ডিকেট
কোরবানি ঈদ মানেই গুরুপাক ভুরিভোজ, তাই মশলার চাহিদাও এ সময়টায় থাকে তুঙ্গে। এক দল মৌসুমি ব্যবসায়ী আবার সময়ের সুযোগ নিয়ে মিয়ানমার থেকে সস্তা মশলা আমদানি করে দেশিয় বাজারে বিক্রি করেন বেশ মোটা অংকের লাভে।

এ তো গেলো এক প্রকার বৈধ সব ব্যবসার ফিরিস্তি- যেগুলো সমাজ খুব খারাপভাবে দেখে না। পাশাপাশি এই উৎসবকে ঘিরে তৎপর থাকে অসাধু বেশ কিছু সিন্ডিকেট। এবার অসাধু ব্যবসায়ীদের তালিকা দেখুন।

অসাধু টিকিট ব্যবসায়ী: ঈদ পালনে ঘরমুখো মানুষের ঢল নামার এই সময়টাকে ব্যবহার করে একটি সিন্ডিকেট ট্রেন-বাস-লঞ্চের টিকেট কালোবাজারি করে, যার ফলে ভোগান্তিতে পড়ে অসংখ্য ঘরমুখো সাধারণ মানুষ।

পশু মোটাতাজাকরণ সিন্ডিকেট: ওদিকে অসাধু আরেকটি চক্র পশু মোটাতাজাকরণের অবৈধ ওষুধ নিয়ে করে নোংরা বাণিজ্য। গত বছর এমন সব সিণ্ডিকেটের সাথে দেশের শীর্ষ পর্যায়ের ২৩ জন পশু উন্নয়ন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গিয়েছিলো। এসব ওষুধ ব্যবহার করে পশুকে কৃত্রিমভাবে সুঠাম দেখানো যায় বলে অসাধু পশু বিক্রেতাদের কাছে এসব ওষুধের চাহিদা রয়েছে। তাদের চাহিদার ওপর ভিত্তি করেই রমরমিয়ে চলে এই অবৈধ ব্যবসা।

জাল নোট ব্যবসায়ী: কোরবানি ঈদ এলেই যে অসাধু চক্রটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে পাল্লা দিয়ে সক্রিয় হয়, তারা হলো জাল নোট প্রস্তুতকারী গোষ্ঠী। খোলা ময়দানে অবাধে নগদ টাকার সব থেকে বড় লেনদেনের সময় এই ঈদের সময়টি হওয়ায় তারাও তখন সক্রিয় হয়ে ওঠে। এ ব্যাপারে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এখন সিটি কর্পোরেশন/পৌরসভা বা হাট কমিটির তরফে প্রতিটি হাটে জাল নোট শনাক্তকরণ মেশিন রাখা হচ্ছে বেশ কয়েক বছর যাবত।

শুধু ধার্মিক মুসলিমের জন্যই নয়, মৌসুমি ব্যবসায়ীদের জন্যও এই ঈদুল আযহা আনন্দের এক অন্য মাত্রার উপলক্ষ। ভালো-মন্দের মিশেলে ঈদের মৌসুমের মৌসুমি ব্যবসায়ীগণও হয়ে গেছেন ঈদ আয়োজনেরই এক ধরণের অংশ।