সিদ্দিকে আকবর রা-এর সময়কাল

আসাদুল্লাহ

ইসলামের ইতিহাসে যার নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখা আছে। ইসলামের ইতিহাসে যিনি সর্বপ্রথম খলীফাতুর রাসুল হিসেবে নির্বাচিত হোন। যিনি জীবনের শুরু থেকেই ইসলামের খেদমত করে আসছিলেন।তার মাধ্যমে ইসলামের বিস্তৃতি ঘটে। সমস্ত সম্পদ ইসলামের জন্য অকাতরে বিলিয়ে দেন। তিনি হলেন আবু বকর সিদ্দিক রা.। যার ব্যাপারে রাসূল সা. বলেন, একমাত্র আবু বকর এর সম্পদই আমার জন্য কাজে এসেছে। আবু বকর রা. বিনাবাক্যে মি’রাজকে সত্যায়ন করার কারনে তাকে “সিদ্দিক আকবর” নামে অভিহিত করা হয়।

তিনি ৫৭৩ সালের অক্টোবর মাসে আরবের বিখ্যাত কুরাইশ বংশের বনু তাইম গোত্রে জম্মগ্রহন করেন। তার নাম পূর্ণ নাম আব্দুল্লাহ বিন আবি কুহাফা তিনি জীবনের শুরু থেকে শেষ অবধি রাসূল সা. এর সঙ্গী ছিলেন। হিজরত এর সময় রাসূল সা. এর সফর সঙ্গী হওয়ার মত সৌভাগ্য লাভ করেন। দশম হিজরীতে যখন রাসূল সা. বিদায় হজ্ব পালন করে মদীনায় ফিরে আসেন এবং তখন থেকেই তিনি ক্রমান্বয়ে অসুস্থ হতে থাকেন। একসময় ভীষন অসুস্থ হয়ে পড়েন। এসময় রাসূল সা. এর নির্দেশে আবু বকর রা. রাসুল সা. এর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চারদিন ইমামতি করেন। ১২ রবিউল আউয়াল রাসূল সা. মৃত্যু বরন করেন। রাসূল সা. এর ওফাতের পর তার উত্তরাধিকার নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। আনসার ও মুহাজিরগন চাইছিলেন তাদের মধ্য থেকে যেন কেউ খলিফা নির্বাচিত হয়। পরবর্তিতে সাকিফা নামক স্থানে আনসারগন আলোচনা শুরু করেন। এতে আবু বকর, উমর, আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ যোগ দেয়। আলোচনার এক পর্যায়ে উমর ইবনুল খাত্তাব রা. আবু বকর রা. কে খলিফা হিসেবে প্রস্তাব করেন। আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ এতে সম্মতি প্রকাশ করেন এবং তিনি ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম খলিফাতুর রাসূল হিসেবে নির্বাচিত হন।

খলিফা নির্বাচিত হয়ে তিনি জনগনের উদ্দেশ্যে ছোট্ট ভাষণে বলেন, ‘আমি আপনাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ নই। আপনাদের সকলের পরামর্শ আমার কাম্য। আমি ন্যায় পথে থাকলে আমাকে সমর্থন করবেন। বিপথগামী হলে সর্তক করবেন। আমি সত্য গ্রহণ করে মিথ্যা বর্জন করবো। আপনারা আমাকে ঐ পর্যন্ত অনুসরণ করবেন যতক্ষণ আমি আল্লাহ তার রাসূলের অনুসরণ করবো’। তিনি জনগনের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ ১০টি উপদেশ দিয়েছিলেন।

১. কারো সঙ্গে প্রতারনা করো না। ২. চুরি থেকে বিরত থাকো। ৩. ব্যভিচার থেকে বিরত থাকো। ৪. বিশ্বাস ঘাতকতা করো না। ৫. রক্তারক্তির কাজ করো না। ৬. মেয়ে লোক ও বয়স্কদের হত্যা করো না। ৭. খেজুর গাছ নষ্ট করো না। ৮. ফলবান বৃক্ষ বিনষ্ট করো না। ৯. শস্যদানা বা শস্যক্ষেত নষ্ট করো না। ১০. প্রয়োজন ব্যতীত গবাদি পশু হত্যা করো না।

যখন হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. খিলাফত গ্রহন করে তখন ইসলামে গাঢ় অমানিশা ছেয়ে আসছিল। সে সময়টি ছিল ইসলামের এক কঠিনতম সময়। এ সময়টিতে মানুষ মুরতাদ হয়ে যাওয়া শুরু করে দেয়। কিছু কিছু সম্প্রদায় যাকাত দিতে অস্বীকৃতি জানায়। আসওয়াদ আনাসী, মুসায়লামা, তোলায়হা এবং সাজাহ নামক ভন্ড নবীদের আর্বিভাব ঘটে। এহেন পরিস্থিতিকে সামনে রেখে সিদ্দিকে আকবর রা. রিদ্দার যুদ্ধের ঘোষণা করেন। রিদ্দার যুদ্ধের মাধ্যমেই কঠোর হস্তে এ সমস্ত ফেৎনাকে মুলোৎপাঠন করেন এবং তার যামানায় তৎকালীন দুটি পরাশক্তি পারস্য ও বাজেইন্টাদের উপর সফল অভিযান পরিচালনা করেন। এর মাধ্যমে ইসলামকে বিস্তৃত করার এক স্বর্ণালী ইতিহাস গড়েন। এতে করে ব্যাপক হারে ইসলামের প্রচার প্রসার শুরু হয়। সিদ্দিকে আকবর রা. যুগে যে সকল উল্লেখযোগ্য কার্যাদি সম্পন্ন হয়। উদাহরণ স্বরূপ: ১. প্রাদেশিক ব্যবস্থা; প্রতিটি প্রদেশে কর্মঠ ও দক্ষ সাহাবীদের গর্ভনর নিয়োগ করা হয়। ২. গর্ভনরদের তত্ত্বাবধান করা। ৩. ইসলামী আইন অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা করা। ৪. প্রতিরক্ষা বাহিনী ব্যবস্থা করা। ৫. যুদ্ধের জন্য অস্ত্র সামগ্রী ব্যবস্থা করা। ৬. সেনাদের তালিম ও তরবিয়ত এর ব্যবস্থা করা। ৭. বাইতুল মালের উন্নতি করা ও গরীব দুঃখিদের মাঝে সঠিকভাবে বন্টন।

সিদ্দিকে আকবর রা. তার তেজদীপ্ত ও অসাধারন বুদ্ধির মাধ্যমে সকল সমস্যা সমাধান করেন। তার হাত ধরেই পরবর্তীতে ইসলাম ব্যাপক হারে বিস্তৃতি লাভ করে। তিনি ২৭ মাসের ও কিছু বেশি সময় খিলাফাতের দায়িত্ব পালন করেন। তার খিলাফতকাল যদিও বা অল্প সময় কিন্তু তার কালেই ইসলামের সৌন্দর্যের অটুট ও স্থায়ী হয়েছিল। ৬৩৪ সালের ২৩ শে আগস্ট তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এমতাবস্থায় তিনি তাঁর উত্তরাধিকার মনোনীত করাকে জরুরি মনে করেন যাতে তার মৃত্যুর পর কোন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়। সাহাবীদের পরামর্শ অনুযায়ী উমর ইবনুল খাত্তাবকে তার স্থলাভিষিক্ত করেন এবং সেদিনই তিনি ইন্তেকাল করেন। তিনি তাঁর মেয়ে ও আমাদের আম্মাজান আয়িশা রা. এর ঘরে রাসূল সা. এর পাশে তাকে দাফন করা হয়।