সাহাবাদের কুরবানি কথন

জুবায়ের মহিউদ্দীন

ঈদ মানেই অনাবিল আনন্দ, উৎসাহ-উদ্দীপনা আর সুখানুভূতির পারষ্পরিক স্বতঃস্ফূর্ত বিনিময়। ঈদুল আজহায় আমাদের যেমন আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ পায়, তেমনি প্রকাশ পায় কুরবানির ইতিহাস ও ঐতিহ্য। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের হাতে শুরু হয় এই কুরবানি প্রথা আর সর্বোত্তম চর্চা শুরু হয় হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে। স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার সাহাবীদের কাজে কর্মে। চিন্তা ও চেতনায়।

সঠিকভাবে কুরবানির জন্য তাই তো উম্মাহর ফকীহগণ হাদিসের বাণী আর সাহাবীদের কর্ম থেকেই নানাবিধ মাসআলার সঠিক সমাধান দিয়ে থাকেন। বর্তমানে আমাদের ভিতর যেমন ঈদের ক’দিন আগ থেকেই কুরবানি নিয়ে উৎসাহ উদ্দীপনার একটা আমেজ ছড়িয়ে যায়, তেমনি সাহাবী কেরামের প্রস্তুতিও চলতো বেশ ক’দিন আগ থেকেই। আবেগ কাজ করতোও প্রচুর পরিমাণে।

একদিনের ঘটনা, এক সাহাবী ঈদের নামাজের আগেই পশু কুরবানি দিয়ে ফেলেন, নেককাজে প্রতিযোগিতার জন্য। পরে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গিয়ে খুলে বললেন। নবীজি স. তখন ঈদের নামাজের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। উপস্থিত মুসল্লিদের সামনেই তিনি মাসআলা জিজ্ঞেস করলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বড় সহনশীলতা ও সরলতার সাথে ঈদের বিধান, কুরবানির সঠিক নিয়ম শুনিয়ে বললেন, প্রিয় সাহাবী! তোমার এই পশু কুরবানি কেবলই গোশত ভক্ষণের জন্য। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য গ্রহণযোগ্য কুরবানির সঠিক নিয়ম হলো ঈদের নামাজের পর পশু জবাই করা।
সাহাবী হযরত আবু বুরদাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু একবার ভুল পন্থায় কুরবানি দিলে যখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন কুরবানির সঠিক নিয়ম এভাবে নয়। তখন তিনি আরেকটি পশু জবাই করার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন। অথচ অল্পবয়সী মেষবাচ্চা ছাড়া সাহাবী আবু বুরদাহ’র কাছে আর কিছুই ছিলো না। ইসলামের বিধান পালনে সাহাবীদের এই আকুলতার জন্যই ঘোষিত হয়েছে-“আল্লাহ তায়ালা তাদের উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন।” প্রভুভক্তি ও রাসূলের আনুগত্যের এরকম হাজারো উদাহরণ রচিত হয়েছে এইসকল যুগশ্রেষ্ঠ মানুষের হাতে।

কুরবানির ঈদে পশু জবাইয়ের মাধ্যমে বিত্তের আভিজাত্য নয় বরং চিত্তের আভিজাত্যের প্রকাশ ঘটিয়ে গরীব-দুঃস্থ সকলের জন্য একটু ভালোমানের খাবারের ব্যবস্থা করার এই মানসিকতা আমরা সাহাবাদের থেকে পেয়েছি। একবার আরবে খাদ্য-সংকট দেখা দিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা দিলেন, কুরবানিকৃত পশুর গোশত জমা করে রাখা যাবে না। তিনদিনের অধিক খাওয়া যাবে না। গরীব, দুস্থ, অসহায়দের মাঝে জবাইকৃত পশুর গোশত বিলিয়ে দিতে হবে। সাহাবীরা সকলেই উদার চিত্তে বিলাতে প্রস্তুত হয়ে গেলেন। গ্রামাঞ্চল থেকে মুসলমানেরা মদীনায় এলো দলে দলে। দফ বাজিয়ে, সূর তুলে শহরের অলিতে-গলিতে ঘুরতে লাগলো খাবারের সন্ধানে। বিত্তশালী সাহাবীদের স্বতঃস্ফূর্ত গোশত বিলানো, শহরে আগত সরলমনা মুসলমানদের খাদ্যাভাব দূরীকরণের এই উচ্ছ্বসিত আয়োজনে ছিল কী পবিত্রতা! ভাবতেই মনটা নেচে উঠে।

প্রাক-ইসলামী যুগে কুরবানিপ্রথা থাকলেও প্রাণী জবাই করা হতো বিভিন্ন দেব-দেবীর নামে, পাথরের নামে। ইসলামের আগমণে এসব মূর্খতার মূলোৎপাটনের পাশাপাশি কুরবানির সঠিক তাৎপর্য ও সৌন্দর্যকে প্রতিষ্ঠিত করা হয় সমাজের বুকে। গৃহপালিত পশুর গর্ভের প্রথম বাচ্চা, গর্ভপাত করা পশু, পাঁচবার, সাতবার গর্ভধারণ করা পশুকে এরা বিভিন্ন কাল্পনিক দেবীর নামে উৎসর্গিত করে কুরবানিপ্রথাকে হাস্যকর কুসংস্কারে মুড়িয়ে রেখেছিলো ইসলাম-পূর্ব সমাজ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাহাবীদের সাথে নিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠা করলেন কুরবানির সঠিক ও স্বচ্ছ বিধান। মানুষেরা জানতে পারলো এসব পশুর সৃষ্টি মানুষের জন্যই। এর গোশত ভক্ষণ ও অন্যান্য উপকার সব মানুষের জন্যই।

কুরবানির গুরুত্ব ও মহিমা সাহাবিদের অন্তরে এতটাই বদ্ধমূল ছিল যে ইসলামের সবচেয়ে নাযুক পরিস্থিতি যেমন হযরত উসমান রাযিয়াল্লাহু তায়ালার খিলাফাতের অন্তিমকাল ও হযরত আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুর খিলাফাতের সূচনালগ্নের সে ক্রান্তিকালেও সাহাবাগণ স্বপ্রণোদিতভাবেই ঈদের দিন পশু কুরবানি দিয়েছেন। সামাজিকভাবে সবাই এসব বণ্টন করেছেন নিজেদের মাঝে। গরিব অসহায়দের মাঝে। সমাজের নিম্নশ্রেণী, গ্রাম্য বেদুইনদের জন্য একটু ভালোমানের খাবারের নিশ্চয়তা ছিলো এসব ঈদের উচ্ছ্বসিত ইবাদতে।

সাহাবাদের নিজেদের পারষ্পরিক ভালোবাসা ও ভাব বিনিময়ের জন্য সর্বোত্তম পন্থা ছিলো নিজেদের মাঝে কুরবানির পশু বণ্টন করা। একবার হযরত আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু দীর্ঘদিনের সফর শেষে গৃহে প্রত্যাবর্তন করলেন। ফ্রেশ হওয়ার পর প্রিয় সহধর্মিণী নবীকন্যা হযরত ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহা সর্বপ্রথম নিজেদের জবাইকৃত কুরবানির পশুর গোশত সামনে দিলেন আপ্যায়নের জন্য। হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহুর পবিত্র জীবনীতেও এমন সব ঘটনার সন্ধান মিলে। হাদিসের অধ্যয়নে মেলে এমন সব ভালোবাসার নিদর্শন। কী অপূর্ব!

ধনী গরীবের পার্থক্যকারী আভিজাত্যকে মিটিয়ে অন্তরের তাকওয়াপূর্ণ কুরবানির জন্য সাহাবারা অমর হয়ে থাকবেন ইতিহাসে। আরবদের সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ উট হওয়া সত্ত্বেও সাহাবারা সারাবছর নিজের প্রিয় উটটিকে খাইয়ে দাইয়ে আরো পরিপুষ্ট করে তুলতেন কেবল নিজ হাতে প্রিয় বস্তুকে কুরবানি দেওয়ার জন্য। এরপর কুরবানির দিন নিজেদের এতদিনের পালিত প্রিয় উটের গলায় ছুরি বসিয়ে দিতেন মহান আল্লাহর বড়ত্বের ধ্বনি তুলে। এ যেনো মহান রবের শ্বাশ্বতবাণীর বাস্তবায়ন, “বলুন! নিশ্চয় আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জন্ম, আমার মৃত্যু এইসকল আয়োজন বিশ্ব-অধিপতি মহান আল্লাহ তায়ালার জন্যই।”