লেখকঃ আব্দুল্লাহ আল মাছুম।
ইসলামে হালাল যেমন স্পষ্ট,হারামও স্পষ্ট। হালাল ও হারামের স্বতন্ত্র রেখা ইসলামে অত্যন্ত পরিষ্কার। মুসলমান মাত্রই হালাল পথে চলবে। আর হারাম পথ থেকে দূরে থাকবে। যেমন ব্যবসায় হালাল। সুদ হারাম। অতএব মুসলিম ব্যবসায় করবে। সুদ থেকে বিরত থাকবে।
এখন প্রশ্ন হয়,তাই যদি হয়-তাহলে হারাম থেকে বাঁচার নীতিমালা জানার প্রয়োজন কী?
মূলত কোনটা হারাম,কোনটা হালাল তা সচেতন মুসলিম যারা তারা জানেন।
কিন্তু সমস্যা হয়,এমন কিছু ক্ষেত্র আছে যেখানে হালাল-হারাম এমনভাবে সামনে আসে তখন সত্যিই চিন্তায় পড়তে হয়,হালাল কোনটা। হারাম কোনটা।
যেমন সুদি চাকরী করে আবার হালাল ব্যবসায়ও আছে-এমন লোকের দাওয়াত খাওয়া যাবে কি না। সুদের চাকরির দিকে তাকালে মনে হয়-খাওয়া যাবে না। আবার তার হালাল ব্যবসায়ের দিকে তাকালে মনে হয়,খাওয়া যাবে।
এরকম বহু ক্ষেত্র আছে,যেখানে সাধারণ মানুষের পক্ষে হালাল-হারাম নির্ণয় করা সম্ভব হয় না। কখনো মনে হয়,হালাল। কখনো মনে হয় হারাম।
এসবক্ষেত্রের জন্য ইসলামে সুস্পষ্ট কিছু মূলনীতি দেয়া হয়েছে। এসব মূলনীতি জানলে,ভালভাবে বুঝলে আমাদের জন্য খুব সহজেই হালাল পথে চলা সহজ হবে। মূলনীতিগুলো ভালভাবে বুঝা জরুরী এজন্যও যে,এসবক্ষেত্রে শয়তান ধোকা দিতে চায়। বিষয়টাকে ইতিবাচকভাবে পেশ করে। নীতি জানা থাকলে তখন শয়তানের ধোঁকা থেকেও রক্ষা হবে।
হারাম থেকে বাঁচার উপায় : সুন্নাহর একটি গুরুত্বপূর্ণূ দিক-নির্দেশনা:
==================================================
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাদীসে হারাম থেকে বেঁচে থাকার ব্যাপারে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনা প্রদান করেছেন। এ হাদীসের উপর ভিত্তি করেই উলামায়ে ইসলাম হারাম থেকে বেঁচে থাকার বিস্তারিত নীতিমালা পেশ করেছেন।
আলোচনার শুরুতেই আমরা হাদীসটির মূল পাঠ পেশ করছি। এরপর এর প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা তুলে ধরব। এরপর পর্যায়ক্রমে নীতিমালা পেশ করব।
আলোচনা বেশ দীর্ঘ হযে যাচ্ছে। তবে ইনশাআল্লাহ ফায়দা থেকে খালি হবে না।
হাদীসটির মূল পাঠ:
====================================================
عن أبي عبد الله النعـمان بن بشير رضي الله عـنهما قـال: سمعـت رسـول الله صلي الله عـليه وسلم يقول: (إن الحلال بين وإن الحـرام بين وبينهما أمور مشتبهات لا يعـلمهن كثير من الناس فمن اتقى الشبهات فـقـد استبرأ لديـنه وعـرضه ومن وقع في الشبهات وقـع في الحرام كـالراعي يـرعى حول الحمى يوشك أن يرتع فيه ألا وإن لكل ملك حمى ألا وإن حمى الله محارمه ألا وإن في الجـسد مضغة إذا صلحـت صلح الجسد كله وإذا فـسـدت فـسـد الجسـد كـلـه ألا وهي الـقـلب)
হাদীসটির সরল অনুবাদ:
===================================================
“নুমান ইবনে বাশীর রা.বলেন,আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,তিনি বলেছেন-নিশ্চয়ই হালাল স্পষ্ট। হারামও স্পষ্ট।
আর উভয়ের মাঝে আছে বহু সন্দেহজনক বিষয়। অনেকেই তা জানেনা-তা হালালের অন্তভুক্ত। না হারামের অন্তর্ভুক্ত।
যে ব্যক্তি স্বীয় দ্বীন ও সম্মান বাঁচাতে গিয়ে তা পরিত্যাগ করল সে নিরাপদ থাকল। আর যে ব্যক্তি এর কিছু অংশেও নিপতিত হয়,আশংকা হয় সে হারামে নিপতিত হবে। যেমন কেউ যদি সংরক্ষিত তৃণভূমির পাশে পশু চরায় তবে আশংকা আছে যে, সে তাতে নিপতিত হবে। সাবধান,প্রত্যেক বাদশাহের সংরক্ষিত এলাকা থাকে।
সাবধান,আল্লাহর সংরক্ষিত এলাকা হল,তাঁর নির্ধারিত হারামসমূহ।
সাবধান, নিশ্চয়ই মানবশরীরে একটি গোশত-টুকরো আছে। যখন সেটা সঠিক হয়ে যায়,তখন পুরো শরীর ঠিক হয়ে যায়। আর সেটি নষ্ট হলে ,পুরো শরীরও নষ্ট হয়ে যায়। জেনে রাখ,সেই গোশত-টুকরো হল,অন্তর।”
হাদীসটি যেখানে আছে:
==============================================
সহীহ মুসলিম,অধ্যায়:হালাল গ্রহণ ও সন্দেহজনক বিষয় বর্জন। হাদীস নং:৪০৬৩;জামে তিরমিযী,অধ্যায়:ক্রয়-বিক্রয়।
হাদীসটির সনদের মান:
===================================================
হাদীসটির সনদ বিশুদ্ধ। ইমাম মুসলিম রহ.তাঁর সহিহ গ্রন্থে তা সংকলন করেছেন। ইমাম তিরমিযী রহ.বলেছেন-هذا حديث حسن صحيح “এটি বিশুদ্ধ সাহিহ হাদীস।”
ইসলামে হাদীসটির গুরুত্ব ও মর্যাদা:
===================================================
আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী রহ.(বিশিষ্ট ফকীহ ও হাদীস বিশারদ। জন্ম: ৭৬২হি.,২৬ রমাদান। মৃত: ৮৫৫হি.) বলেছেন:
أجمع العلماء على عظم موقع هذا الحديث،وأنه أحد الأحاديث التي عليها مدار الإسلام…
“ইসলামে উক্ত হাদীসটির মহান গুরুত্ব ও মর্যাদার ব্যাপারে সকল আলেম একমত। এটি হল সেইসব হাদীসের একটি ,যার উপর ইসলামের ভিত্তি।
উলামায়ে উম্মতের এক জামাত বলেছেন,এটি হল,এমন হাদীস-যার উপর ইসলামের তিন ভাগের এক ভাগ এসে গেছে। কারণ এ হাদীসে হালাল-হারাম- যা ইসলামের মূল কথা- তা বলে দেয়া হয়েছে। সাথে সন্দেহজনক বিষয়ও পরিত্যাগ করতে বলা হয়েছে। সন্দেহজনক বিষয় ত্যাগের অর্থই হল,নিজ দ্বীন রক্ষা করা। হাদীসের শেষে,মানুষের গুরুত্বপূর্ণ অংশ অন্তরের কথাও বলা হয়েছে। কারণ অন্তুরই সব কিছু। ভাল পথ ও মন্দ,হালাল ও হারাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত এখান থেকেই হয়।
(-তাকমিলাতু ফাতহুল মুলহিম,খ.১,পৃ. ৬২১)
হাদীসটির গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা পড়ুন,আগামী পর্বে।
সহযোগিতায়ঃ ইসলামী অর্থনীতি ফোরাম, বাংলাদেশ।
Comments