ঘ. আমার অন্তরে অন্যদের শাআইরের প্রতি ভালবাসা নেই তো?
ইসলাম ছাড়া অন্য সব ধর্ম এবং দ্বীন ও আখিরাত–অস্বীকার সম্বলিত সকল ইজম সম্পূর্ণ বাতিল ও ভ্রান্ত। এদেরও ‘শাআইর’ ও নিদর্শন আছে, মিথ্যা উপাস্য ও আদর্শ আছে, যেগুলোর কোনো সারবত্তা নেই। কিন্তু ইসলাম এই সবেরউপহাস ও কটুক্তিরও অনুমতি নিজ অনুসারীদের দেয় না। এক তো এ কারণে যে, তা ভদ্রতা ও শরাফতের পরিপন্থী, এছাড়া এজন্যও যে, একে বাহানা বানিয়ে এরা ইসলামের সত্য নিদর্শনের অবমাননা করবে। কুরআন মজীদেআল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ فَيَسُبُّوا اللَّهَ عَدْوًا بِغَيْرِ عِلْمٍ كَذَلِكَ زَيَّنَّا لِكُلِّ أُمَّةٍ عَمَلَهُمْ ثُمَّ إِلَى رَبِّهِمْ مَرْجِعُهُمْ فَيُنَبِّئُهُمْ بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
অর্থ : আল্লাহকে ছেড়ে তারা যাদেরকে ডাকে তোমরা তাদেরকে গালি দিও না। কেননা তারা সীমালঙ্ঘন করে অজ্ঞানতাবশত আল্লাহকেও গালি দিবে; এভাবে আমি প্রত্যেক জাতির দৃষ্টিতে তাদের কার্যকলাপ সুশোভন করেছিঅতঃপর তাদের প্রতিপালকের কাছে তাদের প্রত্যাবর্তন। অনন্তর তিনি তাদেরকে তাদের কৃতকার্য সম্বন্ধে অবহিত করবেন। (আল আনআম ৬ : ১০৮)
তো অন্যান্য কওমের রব, ইলাহ ও শাআইরের উপহাস ও কটূক্তি থেকে বিরত থাকা ইসলামের শিক্ষা, যা স্বস্থানে ইসলামী আদর্শের এক উল্লেখযোগ্য সৌন্দর্যের দিক। কিন্তু এর অর্থ কখনো এই নয় যে, তাদের রব ও মাবুদের (যানিঃসন্দেহে অসার ও অসত্য) এবং এদের শাআইর ও নিদর্শনের (যা পুরোপুরি কল্পনা ও কুসংস্কার প্রসূত) সমর্থন ও সত্যায়ন করা হবে কিংবা এগুলোর প্রশংসা ও মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হবে কিংবা অন্তরে আবেগ ও ভক্তি পোষণকরা হবে। কারণ এ তো সরাসরি কুফর। যদি তা বৈধ ও অনুমোদিত হয় তাহলে তো এরপরে ঈমান ও ইসলামের কোনো প্রয়োজনই অবশিষ্ট থাকে না। আর না উপরোক্ত বিশ্বাস ও কর্মের পরও ঈমানের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায়।ভালোভাবে বোঝা উচিত, কোনো কিছুর কটূক্তি–অবজ্ঞা থেকে বিরত থাকার অর্থ এই নয় যে, ঐ বিষয়কে সম্মান করতে হবে বা সত্য মনে করতে হবে। তো কুফরের শাআইরের সম্মান বা ভালবাসা হচ্ছে পরিষ্কার কুফর। আজকালকিছু মানুষ দেখা যায়, যাদের দৃষ্টিতে নিজেদের তথা ইসলামী শাআইরের তো বিশেষ মর্যাদা নেই, এগুলোর অবমাননাও তাদের মাঝে কোনো প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে না। অথচ এরাই একাত্মতা প্রকাশ করে অন্যদের শাআইরের বিষয়ে।এরা অন্যদের ধর্মীয় উৎসবেও যোগদান করে এবং একে গৌরবের বিষয় মনে করে। একে তারা আখ্যা দেয় ‘সৌজন্য’ ও ‘উদারতা’র চিহ্ন বলে। তাদের জানা নেই, এটা সৌজন্য ও উদারতা নয়, এ হচ্ছে সত্য দীনের বিষয়ে শিথিলতাও হীনম্মন্যতা এবং আপন জাতির সাথে বড় হীন ও গায়রতহীন আচরণ। হায়! তারা যদি বুঝত যে, কুফর ও শাআইরে কুফরের প্রীতি–আকর্ষণ, এসবের সাথে একাত্মতা প্রকাশ এবং এসবের ভক্তি–উপাসনায় সন্তোষ বা আনন্দপ্রকাশও সরাসরি কুফর।
এই শ্রেণীর মানুষের মনে রাখা উচিত, কুরআনে কারীমের আয়াত
إِنَّكُمْ إِذًا مِثْلُهُمْ
অর্থ : … তাহলে তো তোমরাও তাদের মত হবে। (৪ : ১৪০)
এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম–এর ইরশাদ –
من تشبه بقوم فهو منهم
অর্থ : যে কোনো জাতির সাদৃশ্য গ্রহণ করবে সে তাদেরই অন্তর্ভূক্ত।
মোটকথা, নিজের ঈমানের শুদ্ধতা–অশুদ্ধতা যাচাইয়ের অন্যতম উপায় এ চিন্তা করা যে, অন্তরে বেদ্বীন সম্প্রদায়ের এবং দীন ইসলামের বিদ্রোহীদের শাআইর–নিদর্শনের সমর্থন বা প্রীতি–আকর্ষণ নেই তো। যদি থাকে তাহলে তওবাকরে নিজেকে সংশোধন করবে, আল্লাহ তাআলার কাছে শাআইরুল্লাহর ভক্তি–ভালবাসা এবং শাআইরুল্লাহর সংরক্ষণ ও সমর্থনের তাওফীক প্রার্থনা করবে। কুফরের শাআইরের প্রতি ঘৃণা ও সেগুলোর অসারতার বিষয়ে প্রত্যয় ওপ্রশান্তি প্রার্থনা করবে।
ঙ. পসন্দ–অপসন্দের ক্ষেত্রে আমার নীতি উল্টা না তো?
জগতে পসন্দ–অপসন্দের অনেক মানদন্ড আছে। মানুষের স্বভাবটাই এমন যে, এতে সৃষ্টিগতভাবেই কিছু বিষয়ের প্রতি আকর্ষণ রয়েছে আর কিছু বিষয়ে অনাগ্রহ ও বিমুখতা বরং ঘৃণা ও বিদ্বেষ। কিন্তু কেউ যখন ইসলাম কবুলকরে এবং ঈমানের সম্পদ লাভ করে তখন তার হাতে এসে যায় পসন্দ–অপসন্দের প্রকৃত মানদন্ড। সে মানদন্ড হচ্ছে আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর প্রদত্ত শরীয়ত। সুতরাং যা কিছু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কাছে পসন্দনীয় এবংশরীয়তে কাম্য তা মুমিনের কাছে অবশ্যই পসন্দনীয় হবে যদিও অন্য কোনো মানদন্ডে লোকেরা তা পসন্দ না করুক, কিংবা স্বয়ং তার কাছেই তা স্বভাবগতভাবে পসন্দের না হোক। আর যা কিছু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কাছেঅপসন্দের এবং শরীয়তে নিষিদ্ধ তা তার কাছে অবশ্যই অপসন্দনীয় হবে যদিও অন্য কোনো মানদন্ডে লোকেরা তা পসন্দনীয় মনে করে কিংবা স্বভাবগতভাবে তার নিজেরও ঐ বিষয়ের প্রতি আকর্ষণ থাকে। মুমিন সর্বদা নিজেরপসন্দ–অপসন্দকে দ্বীন ও ঈমানের দাবির অধীন রাখে। সে তার স্বভাবের আকর্ষণকে আল্লাহ তাআলার রেযামন্দির উপর কোরবান করে।
এজন্য ঈমান যাচাইয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ উপায় যে, নিজের অন্তরকে পরীক্ষা করা তাতে পসন্দ–অপসন্দের মানদন্ড কী। আল্লাহ, তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও শরীয়তের পসন্দ–অপসন্দ, না প্রবৃত্তির চাহিদা, নিজেরগোত্র, দল, দলনেতা, পার্থিব বিচারে মর্যাদাবান শ্রেণী, শুধু শক্তির জোরে প্রবল জাতিসমূহের সংস্কৃতি, সাধারণের মতামত, পার্থিব জীবনের চাকচিক্য কিংবা এ ধরনের আরো কোনো কিছু?
যদি তার কাছে মানদন্ড হয় প্রথম বিষয়টি তাহলে আল্লাহর শোকর গোযারী করবে আর যদি মানদন্ড হয় দ্বিতীয় বিষয়গুলো তাহেল খালিস দিলে তওবা করবে। নিজের পসন্দকে আল্লাহ ও তাঁর বিধানের অধীন করবে, আল্লাহররাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর উসওয়ায়ে হাসানার (শরীয়ত ও সুন্নতের) অনুগামী করবে এবং ঈমানের তাজদীদ ও নবায়ন করবে।
আল্লাহর পসন্দকে অপসন্দ করা কিংবা আল্লাহর অপসন্দকে পসন্দ করা অথবা আল্লাহর বিধান অপসন্দকারীদের আংশিক আনুগত্য করা, এসবকে কুরআনে হাকীমে আল্লাহ তাআলা মুরতাদ হওয়ার কারণ সাব্যস্ত করেছেন এবংবলেছেন এগুলোর কারণে বান্দার সকল আমল নষ্ট হয়ে যায়। ইরশাদ হয়েছে :
إِنَّ الَّذِينَ ارْتَدُّوا عَلَى أَدْبَارِهِمْ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ الْهُدَى الشَّيْطَانُ سَوَّلَ لَهُمْ وَأَمْلَى لَهُمْ l ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا لِلَّذِينَ كَرِهُوا مَا نَزَّلَ اللَّهُ سَنُطِيعُكُمْ فِي بَعْضِ الْأَمْرِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ إِسْرَارَهُمْ l فَكَيْفَ إِذَا تَوَفَّتْهُمُ الْمَلَائِكَةُ يَضْرِبُونَ وُجُوهَهُمْ وَأَدْبَارَهُمْ l ذَلِكَ بِأَنَّهُمُ اتَّبَعُوا مَا أَسْخَطَ اللَّهَ وَكَرِهُوا رِضْوَانَهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ
অর্থ : যারা নিজেদের কাছে সৎপথ ব্যক্ত হওয়ার পর তা পরিত্যাগ করে, শয়তান তাদের কাজকে শোভন করে দেখায় এবং তাদেরকে মিথ্যা আশা দেয়। এটা এজন্য যে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তা যারা অপসন্দ করে তাদেরকেতারা বলে ‘আমরা কোন কোন বিষয়ে তোমাদের আনুগত্য করব।’ আল্লাহ তাদের গোপন অভিসন্ধি অবগত আছেন। ফিরিশতারা যখন তাদের মুখমন্ডলে ও পৃষ্ঠদেশে আঘাত করতে করতে প্রাণ হরণ করবে, তখন তাদের দশাকেমন হবে! এটা এজন্য যে, তারা তা অনুসরণ করে, যা আল্লাহর অসন্তোষ জন্মায় এবং তার সন্তুষ্টিকে অপ্রিয় গণ্য করে। তিনি এদের কর্ম নিষ্ফল করে দেন। (সূরা মুহাম্মাদ ৪৭ : ২৫–২৮)
একই সাথে পরিষ্কার ঘোষণা করেছে যে, আল্লাহ তাআলার পসন্দ হল ঈমান আর অপসন্দ হল কুফর ও শিরক। আল্লাহর কাছে ঈমান ও ঈমান সংশ্লিষ্ট সবকিছু পসন্দনীয়। আর কুফর, শিরক এবং কুফর ও শিরকের সাথে সংশ্লিষ্টসবকিছু অপছন্দনীয়।
وَلَا تَنْكِحُوا الْمُشْرِكَاتِ حَتَّى يُؤْمِنَّ وَلَأَمَةٌ مُؤْمِنَةٌ خَيْرٌ مِنْ مُشْرِكَةٍ وَلَوْ أَعْجَبَتْكُمْ وَلَا تُنْكِحُوا الْمُشْرِكِينَ حَتَّى يُؤْمِنُوا وَلَعَبْدٌ مُؤْمِنٌ خَيْرٌ مِنْ مُشْرِكٍ وَلَوْ أَعْجَبَكُمْ أُولَئِكَ يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ وَاللَّهُ يَدْعُو إِلَى الْجَنَّةِ وَالْمَغْفِرَةِ بِإِذْنِهِ وَيُبَيِّنُ آَيَاتِهِ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ
অর্থ : মুশরিক নারীকে ঈমান না আনা পর্যন্ত তোমরা বিবাহ করো না। মুশরিক নারী তোমাদেরকে মুগ্ধ করলেও, নিশ্চয়ই মুমিন কৃতদাসী তাদের অপেক্ষা উত্তম। ঈমান না আনা পর্যন্ত মুশরিক পুরুষদের সাথে তোমরা বিবাহ দিও না,মুশরিক পুরুষ তোমাদেরকে মুগ্ধ করলেও, মুমিন কৃতদাস তাদের অপেক্ষা উত্তম। তারা জাহান্নামের দিকে আহবান করে এবং আল্লাহ তোমাদেরকে নিজ অনুগ্রহে নিজ জান্নাত ও ক্ষমার দিকে আহবান করেন। তিনি মানুষের জন্যস্বীয় বিধান সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন, যাতে তারা তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। (আলবাকারা ২ : ২২১)
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يُعْجِبُكَ قَوْلُهُ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيُشْهِدُ اللَّهَ عَلَى مَا فِي قَلْبِهِ وَهُوَ أَلَدُّ الْخِصَامِ l وَإِذَا تَوَلَّى سَعَى فِي الْأَرْضِ لِيُفْسِدَ فِيهَا وَيُهْلِكَ الْحَرْثَ وَالنَّسْلَ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الْفَسَادَ l وَإِذَا قِيلَ لَهُ اتَّقِ اللَّهَ أَخَذَتْهُ الْعِزَّةُ بِالْإِثْمِ فَحَسْبُهُ جَهَنَّمُ وَلَبِئْسَ الْمِهَادُ
অর্থ : আর মানুষের মধ্যে এমন ব্যক্তি আছে, পার্থিব জীবন সম্পর্কে যার কথাবার্তা তোমাকে চমৎকৃত করে এবং তার অন্তরে যা আছে সে সম্বন্ধে সে আল্লাহকে সাক্ষী রাখে। প্রকৃতপক্ষে সে ভীষণ কলহপ্রিয়। যখন সে প্রস্থান করেতখন সে পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টির এবং শস্যক্ষেত্র ও জীবজন্তু ধ্বংসের চেষ্টা করে। আর আল্লাহ অশান্তি পসন্দ করেন না। যখন তাকে বলা হয় ‘তুমি আল্লাহকে ভয় কর তখন তার আত্মাভিমান তাকে পাপে লিপ্ত করে, সুতরাংজাহান্নামই তার জন্য যথেষ্ট। নিশ্চয়ই তা নিকৃষ্ট বিশ্রামস্থল। (আলবাকারা ২ : ২০৪–২০৬)
وَلَا تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِنْهُمْ مَاتَ أَبَدًا وَلَا تَقُمْ عَلَى قَبْرِهِ إِنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَمَاتُوا وَهُمْ فَاسِقُونَ l وَلَا تُعْجِبْكَ أَمْوَالُهُمْ وَأَوْلَادُهُمْ إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ أَنْ يُعَذِّبَهُمْ بِهَا فِي الدُّنْيَا وَتَزْهَقَ أَنْفُسُهُمْ وَهُمْ كَافِرُونَ
অর্থ : তাদের মধ্যে কারো মৃত্যু হলে তুমি কখনো তার জন্য জানাযার সালাত আদায় করবে না এবং তার কবরের পাশে দাঁড়াবে না। তারা তো আল্লাহ ও তার রাসূলকে অস্বীকার করেছিল এবং পাপাচারী অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়েছে।সুতরাং তাদের সম্পদ ও সন্তান–সন্ততি তোমাকে যেন মুগ্ধ না করে। আল্লাহ তো এর দ্বারাই পার্থিব জীবনে শাস্তি দিতে চান; তারা কাফির থাকা অবস্থায় তাদের আত্মা দেহ ত্যাগ করবে। (আততাওবা ৯ : ৮৪–৮৫)
চলবে ইনশা-আল্লাহ…………..
Comments