সবার আগে শিশু

কাজী আবুল কালাম সিদ্দীক

‘শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ’-প্রতিবছরই এই আপ্তবাক্যটির পুনঃ পুনঃ উচ্চারণ শোনা যায় বিভিন্ন মহলে। সবাই ‘আজকের শিশুটিই আগামীর ভবিষ্যত’ বলছেন, ‘তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে’ ইত্যাদি আওড়াচ্ছেন, কিন্তু বাস্তবে দেশের দু’দশজন ধনীর দুলাল ছাড়া বেশিরভাগ শিশুই এখনো অবহেলিত থাকছে। যে বয়সে স্কুলে যাবার কথা সে বয়সে অভাবের সঙ্গে যুদ্ধে নেমে পড়ছে অনেক শিশু। জঠর-জ্বালা নিবারণে তারা স্কুল-মাদ্রাসা ত্যাগ করে কর্মক্ষেত্রে নেমে পড়ছে। শিশুশ্রম বাংলাদেশে নিষিদ্ধ, যা কেবল পুঁথির ভাষার মতোই আমরা মুখস্থ করেছি, বাস্তবে এর চিত্র ভয়াবহ। আজ অভাবের তাড়নায় ১০-না-পেরোনো অনেক শিশুকেই কায়িক শ্রমে অর্থোপার্জন করতে দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন স্যাটেলাইট টিভিতে শিশুদের কায়িক শ্রমের এসব সচিত্র প্রতিবেদন প্রচার হচ্ছে। কিন্তু কেউ এগিয়ে গিয়ে তাদের কাজ থেকে উঠিয়ে এনে স্কুলে পাঠানোর ব্যবস্থা করেনি। অথচ রাষ্ট্র ও সমাজের বিত্তবানরা কায়মনোবাক্যে এগিয়ে এলে এর সুরাহা হতে পারত। সত্যি সত্যিই আজকের শিশুটি আগামীর ভবিষ্যত হতে পারত।

শিশুদেরকে ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করা হলে, একদিন তারাই এই জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে উন্নতির পথে। দেখাতে সমর্থ হবে আলোর পথ। তাই শিশু শিক্ষা ব্যবস্থায় আকিদা সমন্ধে (তাওহীদ, রেসালাত, কিয়ামত, পরকাল, ফেরেশতা, কবরের জগৎ) ও নবী-রাসূল সম্পর্কে পাঠ থাকা আবশ্যক। সর্বোপরি আরও একটি বিষয় গুরুত্ব সহকারে শিখানো- সেটা হলো আদব। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থাকে আমরা কোনোক্রমেই অস্বীকার করতে পারি না। তাই আপনার সন্তান স্কুলে অধ্যায়ন করলেও, সকল ব্যস্ততার মাঝেও তাদের যেন ইসলামিক চেতনায় উজ্জীবিত করা যায়, এমন কিছু প্রচেষ্টা নিয়েই আজকের এই আলোচনা। মূল আলোচনার পূর্বে শিশুদের শিক্ষা বিষয়ক কয়েকটি অমূল্য হাদিস উল্লেখ করা হলো।

১. হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কোনো পিতা তার সন্তানকে এর থেকে উত্তম উপঢৌকন প্রদান করতে পারেন না, তিনি তাকে যে উত্তম শিক্ষা (ইসলামী শিক্ষা) প্রদান করেন। -তিরমিযী

২. হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ননা করেন, হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, শিশুর যখন কথা ফুটতে শুরু করবে তখন সর্বপ্রথম তাকে কালিমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ শিখাবে, আর মৃত্যুকালেও তাদের ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র তালকীন দিবে। কেননা যার প্রথম বাক্য ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এবং শেষ বাক্য ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ হবে সে যদি হাজার বছরও বেঁচে থাকে তাহলে তাকে কোনো গোনাহ ও পাপের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না। -বায়হাকি

৩. হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্নিত, হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা স্ব স্ব সন্তানদেরকে তিনটি স্বভাবের অনুসারী করে গড়ে তোলো।
ক. তাদেরকে হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালোবাসা শিক্ষা দাও।
খ. হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশধরদের প্রতি ভালোবাসা শিক্ষা দাও।
গ. তাদের মধ্যে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের অভ্যেস গড়ে তোলো।

কেননা কুরআনের ধারক ও বাহকরাই সেদিন আম্বিয়ায়ে কেরাম এবং সাধু সজ্জনদের সাথে আরশের ছায়ায় অবস্থান করবে যেদিন আরশের ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না । -তিবরানী

উপরোল্লেখিত হাদিসসমূহের মাধ্যমে আমরা অতি সহজেই অনুধাবন করতে পারি ইসলামী শিক্ষার গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্বন্ধে।

তাই এবার আসুন, ৪ থেকে ১০ বছর বয়সের শিশুদের ইসলামী শিক্ষার ব্যাপারে প্রায়োগিক ক্ষেত্রে আমরা কোন কোন পথ অবলম্বন করতে পারি বা কিভাবে অগ্রসর হতে পারি সে সম্বন্ধে।

প্রাথমিক শিক্ষা : একটি শিশুকে ৪/৫ বছর বয়সেই আমরা স্কুলে দিয়ে থাকি। ৪ বছরে না দিয়ে বরং ৫ বছরে তাদের স্কুলে দেয়া যেতে পারে। এবং এর পরিবর্তে এই ১ বছর তাদের ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা যেতে পারে। একটি বছর খুব বেশী নয়। ১৫/২০/২৫ বছর মার্স্টাস ডিগ্রি বা অন্যান্য ডিগ্রি অর্জন করার জন্য ব্যয় করে থাকি। আমরা কি পারি না জীবনের শুধুমাত্র একটি বছর সন্তানের শিক্ষার জন্য আল্লাহতায়ালার জন্য নিবেদন করতে? এই এক বছরে যদি শিশুদের চেতনায় ইসলামের প্রতি আগ্রহী করে তোলা যায়, তাহলে পরবর্তীকালে দেখবেন অল্প অল্প করে সে-ই ইসলামী বিষয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে তুলবে। নাস্তিক বা প্রগতিবাদ পরিচয়ে ইসলামের সমালোচনা করবে না।

সাধারনত দেখা গেছে, যেসব শিশু ছোটকালে কিছুটা হলেও ইসলামকে জেনেছে, প্রিয় নবীজীর (সাঃ) জীবনী পড়েছে, আদব-কায়দা শিখেছে, নামাযের নিয়ম-কানুন জানে তারা কখনও নাস্তিক হয় না।

আগে নিজে শুদ্ধ হোন : শিশুদের কোনো বিষয় শিখানোর আগে ভালোভাবে খেয়াল করুন, নিজেদের মধ্যে সেই দোষ বা গুণটা আছে কিনা? ‘সদা সত্য কথা বলবে’ এটা শিখানোর আগে বাবা মা’র সত্য কথা বলার অভ্যাস করা উচিত। আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ শিশু মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করছে। তাই আগে আমাদের ঠিক হতে হবে।

টিভির থেকে দুরে রাখুন : শিশুদেরকে ভয়ংকর নেশা এবং বিষতুল্য ‘টেলিভিশন’-এর প্রতি আগ্রহী করে তুলবেন না। অনেক শিশু আছে ‘কার্টুন’ না দেখলে খাবার খায় না। এটা অভ্যাসের ব্যাপার। এটা পরিত্যাগ করুন। বর্তমানে টেলিভিশনের মাধ্যমে যেভাবে পশ্চিমা সংস্কৃতি বিস্তার লাভ করেছে তার থেকে আপনার সন্তানকে দুরে রাখুন। অনেকে বলে থাকে ‘টেলিভিশন’-এর মাধ্যমে জ্ঞান চর্চা হয়। তাহলে আমার প্রশ্নÑ গত এক মাসে যদি আপনারা কেউ টেলিভিশন নিয়মিত দেখে থাকেন তাহলে কি বলতে পারেন এই সময়ের মধ্যে আপনি কি এমন কোনো প্রোগ্রাম দেখেছেন যেখানে শিখিয়েছে-‘সত্য কথা বলা, পিতা-মাতার সেবা করা, আল্লাহকে চেনার মত চেনা ও রোগীদের সেবা করা উচিত।’ আমি কসম করে বলতে পারি এর সবগুলোরই উত্তর- না।

এ ধরণের প্রোগ্রাম টেলিভিশনে দেখানো হয় না; বর্তমানে দেখানো হয়। পরকীয়া প্রেমের রগরগে কাহিনী আর ভালোবাসার নামে মিথ্যাচার ও নোংরামী ইত্যাদি।

অনেকেই বলে থাকেন টিভির মাধ্যমে মুক্তমনের বিকাশ হয়, জ্ঞানের চর্চা হয়। কখনও কি বিচার করে দেখেছেন; কথাটা কতটুকু সত্য? আজ অন্তত ২ মিনিটের জন্য হলেও বিচার করুন, চিন্তা করুন। ইনশাল্লাহ আল্লাহর মর্জি হলে আপনি সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে পারবেন।

শিশুরা যাতে টিভি, নাটক, গান এগুলোতে অভ্যস্থ না হয়ে ওঠে সেজন্য তাদের পড়াশুনার প্রতি আগ্রহী করে তুলুন। বাসায় লাইব্রেরী গড়ে তুলুন। প্রতিদিন অথবা সপ্তাহে অন্তত: একদিন কিছু সময় আপনি তাদের সাথে বসে ধর্মীয় বিষয়ে আলোচনা করুন। নির্দিষ্ট কোনো বই নিয়ে তাদের পড়ে শুনান। নবী রাসূলদের কিংবা সাহাবীদের, কিংবা আউলিয়ায়ে কেরামদের জীবনী হলে আরও ভালো হয়।

কিছু বই আপনি পাবেন যারা বাচ্চাদের উপযোগী বর্ণনাসমৃদ্ধ করে বের করেছে, সেগুলো সংগ্রহ করে অল্প অল্প করে পড়ে দেখুন এবং তাদের পড়ে শোনান। অনেকে সময় বাচ্চাদের সরাসরি আদেশ করলে তারা শোনে না। সেজন্য সবচেয়ে উত্তম হচ্ছে তাদেরকে বেশী বেশী করে উপদেশমূলক ঘটনা শোনানো। রিসার্চ করে দেখা গেছে, কোনো শিশুকে ঘটনা বললে তারা গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনে। এক্ষেত্রে আমরা তাদের ইসলামিক চেতনাসমৃদ্ধ ঘটনা বেশী বেশী কওে শোনাতে পারি।

শিশুদেরকে সময় দেয়া : কথাটা সর্বাংশে সত্য। স্বামী-স্ত্রী সারাদিন চাকরিতে ব্যস্ত থাকলে, শিশুরা সাধারণত বুয়াদের কাছে মানুষ হয়। সেই শিশুদের চেতনায় আপনার মন-মানসিকতা থাকবে নাকি বুয়াদের কালচারে বড় হয়ে উঠবে? তারা আপনার ভাষা শিখবে, নাকি বুয়াদের ভাষা শিখবে? যারা সমঅধিকারে বিশ্বাসী, তাদের কাছে একটি প্রশ্ন- ‘শিশুকে কে মানুষ করবে? বাবা নাকি মা?’ একজন মা’র সর্বশ্রেষ্ট ভূমিকা হওয়া উচিত ছিল সে কিভাবে তার শিশুকে জ্ঞান বিজ্ঞান, উন্নত মন-মানসিকতা, পরোপকার ইত্যাদি শিক্ষা দিবে। অথচ এ প্রশ্নের উত্তরে মিডিয়া নীরব। যেন শিশুরা এই জাতির কোনো অংশই নয়।

মায়ের জন্য গৌরবের বিষয় যে, সে তার শিশুকে ইসলামিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলবে। অথচ সেই মাকে আমরা মিছিল, মিটিং, চাকুরীসহ ইত্যাদি কাজে এমন ব্যস্ত করে রেখেছি যে, একজন এয়ার হোস্টেস ১০ জন পুরুষের সেবা করতে পারে, খাবার সার্ভ করতে পারে, অথচ তার বাসায় তার স্বামীকে এক কাপ চা দেয়ার মতো সময় তার হাতে নেই, প্লেনে একটি শিশু অসুস্থ হয়ে গেলে সে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় দিচ্ছে, অথচ তার শিশুকে নাপা সিরাপ দিচ্ছে কাজের বুয়া। তাই আজ আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে করপোরেট কালচার আমাদের কি দিচ্ছে। লাভের পাল্লার চেয়ে ক্ষতির পাল্লা দিন দিন ভারী হচ্ছে না তো?

আরো পড়ুন পোস্ট করেছেন

Comments

লোড হচ্ছে...
শেয়ার হয়েছে