আমার মনে প্রশান্তি ছিল না (দ্বিতীয় পর্ব)

জীবনধারাঃ বিয়ে কীভাবে হল?
জুনাইদ জামশেদঃ আসলে বিয়ে হয়নি বরং বিয়ে করিয়ে দেয়া হয়েছে। আমার আব্বু তো ছিল বিমানবাহিনীর পাইলট। তো উনি বললেন যে আমার তো বিয়ে হয়েছে ২৪ বছর বয়সে আর জুনাইদেরও বয়স ২৪ তাই বিয়ে দেয়া উচিত, আবার আম্মুর ভয় ছিল যে, ছেলে শোবিজে যাচ্ছে না জানি আবার পছন্দ করে বিয়ে করে কিনা? তাই আমার খালা সম্বন্ধ নিয়ে এলেন। তো আমি ঐদিন আয়েশাদের বাসায় গেলাম মেয়ে দেখতে আর আমার চোখে চশমা ছিল না কারণ, রাতে চশমা পড়ে ঘুমাতাম আর প্রায়ই চশমা ভেঙ্গে যেত । তো ঐদিনও হয়েছিল তাই। আমি বসে আছি তো আয়েশার সাথে ওর খালা বসে ছিল। আমি ভালভাবে দেখতে পারছিলাম না আবার বসা দুইজন। তাই আমি ছিলাম সন্দিহান। আমি খালুশ্বশুরের সাথে কথা বলছিলাম। তো খালা এসে বললেন যে, পছন্দ হয়েছে? আমি বললাম, আগে তো বলেন যে এদের মধ্যে কোনটা ছিল? খালা বললেন যে তুই কি পাগল নাকি? ছিল এই জন। আমি তো আর দেখতে পাচ্ছিলাম না । যাক এভাবেই বিয়ে হয়ে গেল।

জীবনধারাঃ জীবনে স্ত্রীকে কেমন পেয়েছেন?
জুনাইদ জামশেদঃ অনেক সহায়তাকারী। মাশাআল্লাহ। ও এত খেয়াল রাখত মায়ের যে আমার আম্মু তো মারা যাওয়ার আগে আয়েশাকে নিজের বেটি বলে গেছেন । আল্লাহ তাঁকে জান্নাত নসিব করুন।

জীবনধারাঃ আম্মুর কোন স্মৃতি মনে পড়ে?
জুনাইদ জামশেদঃ অনেক। প্রতিদিন ঘর থেকে বের হওয়ার সময় গেটের কাছে আম্মু দাঁড়াতেন আর আমাকে দোয়া দিতেন। কোনদিন যদি তাড়া থাকতো তখন তাড়ার মাঝেও ডাক দিতেন ‘জুনাইদ!’ আমি ব্যাক করলে বলতেন বেটা! বলে তো যাও!! আজ বড় মিস করি মাকে। এখন তো বাবাও নাই।

জীবনধারাঃ ছেলেমেয়ে কয়জন?
জুনাইদ জামশেদঃ তিন ছেলে- তৈমুর, বাবর আর সাইফ এবং এক মেয়ে যাহ্‌রা।

জীবনধারাঃ সন্তানদের মাঝে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখেন?
জুনাইদ জামশেদঃ আমি যেমন বড় ভাই হিসেবে একটু নেতৃত্ব টাইপ তেমনি তৈমুরও। আর ছোটছেলেটা আমার মত চশমা ভাঙ্গে রাতে ঘুমিয়ে।

জীবনধারাঃ কি খেতে বেশী পছন্দ?
জুনাইদ জামশেদঃ সী-ফুড ।

জীবনধারাঃ পোশাকে কি পছন্দ?
জুনাইদ জামশেদঃ এই পাঞ্জাবী আর সেলওয়ার তথা সুন্নতি পোশাক।

জীবনধারাঃ মিউজিক ছেড়ে নাত-হামদ পড়ছেন। কীভাবে এই পথচলা?
জুনাইদ জামশেদঃ মিউজিক ছাড়ার পর তো কষ্টের দিন গেছে অনেক। তো একদিন আমার অনেক পছন্দের একজন ব্যাক্তি মুফতি তাকি উসমানি সাহেব আমাকে বললেন, জুনাইদ! আল্লাহ তোমাকে এক চমৎকার কণ্ঠ দিয়েছেন এটাকে ব্যবহার কর, আল্লাহ ও রাসুলের স্তুতি গাও। তখন তিনি তাঁর লিখা ‘ইলাহি তেরে চৌকাঠ পার’ গানটি দিয়ে বললেন যে রেকর্ড করাও। আমি করলাম। আলহামদুলিল্লাহ্‌ ভালো চলল। তখন ভাবলাম যে আমি তো পপ জগতের উন্নতিতে ছিলাম তো এখন হামদ ও নাত কে উন্নত করি, তখন বিশ্বের নানান ভাষার নাত ইত্যাদি শুনে সিদ্ধান্ত নিলাম যে এভাবেই নাত পড়ব। আগে ফোকাস ছিল শুধু দেশ আর এখন সারা বিশ্ব।

জীবনধারাঃ কার লিখা কালাম ভাল লাগে?
জুনাইদ জামশেদঃ আল্লামা ইকবাল, মাওলানা জামী,কাহলিল জিবরান আর আমাদের নাসির ভাই । এছাড়াও দেশের অন্যান্য রাইটারদের নাতও পড়ি তবে তারিক জামিল সাহেবের সাথে বসে বাছাই করি।

জীবনধারাঃ আপনার মিউজিক ছেড়ে আসার পর বলা হচ্ছে যে মিউজিকের অধঃপতন শুরু হয়েছে পাকিস্তানে। কি বলবেন?
জুনাইদ জামশেদঃ অনেকাংশে সত্য। এই যে, আমজাদ ভাই নাত পড়ছেন, আলী হায়দার টিভিতে নাতের শো করছে, নাজম শিরাজ, আলমগীর এরা সবাই নাত পড়ছে। তারপর ‘নেটিভ দ্বীন’ নামক নতুন নাতের দল গঠন করেছে আমেরিকার নামকরা পপ শিল্পীরা।

জীবনধারাঃ তাবলীগের কাজ করছেন আবার নাতও পড়ছেন। মুরুব্বিদের থেকে বিধিনিষেধ আসেনি?
জুনাইদ জামশেদঃ না। বরং আমাদের এখানে আব্দুল ওয়াহহাব ভাই এসেছিলেন তো আমি তাঁকে এই বিষয় বললে উনি বললেন যে, অবশ্যই যাও। তাহলে তোমার পিছনের গানগুলো নাতের কারণে ঢাকা পড়ে যাবে।

জীবনধারাঃ আমির খানের সাথে নাকি হজ্বে দেখা হয়েছে?
জুনাইদ জামশেদঃ হ্যাঁ। মাওলানা তারিক জামিল সাহেব ও আমি গেছিলাম আমির খানের সাথে মোলাকাত করতে। সেখানে সবাই ছিল সিনেমার মানুষ। তবে সবাই মুসলমান ছিল। মাওলানা তাঁর সাথে কথা বলছিলেন আর সে মাওলানার ভক্ত হতে শুরি করছিল। আমি বলছিলাম যে মাওলানা উঠি! কিন্তু আমির বলছিল না না আমি খাবার আনতে বলেছি খেয়ে যাবেন ইত্যাদি। তো যখনই আমির ভেতরে যেত তখন তাঁর অসুস্থ মা বলতেন যে আমার ছেলের জন্য দোয়া করেন! কিন্তু মাওলানা তাঁর সাথে তাঁর সামাজিক কিছু প্রোগ্রাম নিয়ে আলোচনা করছিলেন। আমি এসব শুনে আমার পার্টনার সোহেলকে বললাম যে, এই সব মাওলানা কীভাবে জানে? পরে শুনলাম যে আগে জেনে নিয়েছেন, তো মাওলানা তাঁকে বলছিলেন যে তোমার এই প্রোগ্রাম সম্পর্কে আল্লাহর নবী এই বলছেন, এই বলছেন সুতরাং এটাকে এভাবে করো। তখন আমির অবাক হয়ে বলল যে, আমাদের নবী এই বিষয়েও বলেছেন? তখন সবগুলো হাদিস লিখে নিল আর আমি অনুবাদ করলাম ইংলিশে। তো আমির খানের সাথে এখন মাওলানার সম্পর্ক আমার সাথে যেমন ছিল তেমনই। আমি জিজ্ঞেস করলাম মাওলানাকে যে তাঁর সাথে নামাজের কথা বলেন না কেন? সিনেমা ছাড়ার কথা বলেন না কেন? তিনি বললেন, তোমার সাথে বলেছিলাম এই ধরনের কথা? আমার জানা আছে কখন তাঁকে বলতে হবে তখন ইনশাআল্লাহ বলব। আরো মজার বিষয় হল হজ্বের পর আমির খানের একটা সিনেমা রিলিজ হয় তো সে মাওলানাকে ফোন দিয়ে বলল, মাওলানা! আপনার দোয়ায় আমার সিনেমা হিট হয়ে গেছে। তখন মাওলানা আমাকে বলল যে, দেখ আমরা তাঁকে সিনেমা হতে তওবা করানোর ফিকিরে ব্যস্ত আর সে বলেকি? আমার দোয়ায় নাকি সিনেমা হিট হয়েছে।

জীবনধারাঃ আপনিতো টিভিতেও প্রোগ্রাম করছেন এখন?
জুনাইদ জামশেদঃ হ্যাঁ। তবে আমার টিভিতে আসার মোটেও ইচ্ছা ছিলনা। কিন্তু উলামায়ে কেরাম বললেন তাই আসলাম। তারপরও সব কিছু পরামর্শ নিয়েই করি।

জীবনধারাঃ টিভিতে আপনার শো তে নানান সময় মেয়েদের উপস্থিতি দেখা যায়। ইসলামের উপকারে টিভির অবদানের ব্যাপারে কি বলবেন?
জুনাইদ জামশেদঃ আসলে টিভি এমন এক মাধ্যম যার আশেপাশে অনেক ময়লা। এখান থেকে পূর্ণ ইসলামী মেজাজ তখন পাবেন যখন টিভি পুরো ইসলামিক নিয়মে চলবে। তবে মেয়েদের জন্য যতটুকু করা সম্ভব ইসলামের পক্ষ থেকে তা করা হয়। এছাড়া নিজের সহিহ নিয়ত, আল্লাহর প্রতি এক্বিন, আল্লাহকে হাজির-নাজির মানা, সওয়াবের আশা, রাসুলের তরিকা ইত্যাদি বিষয়কে মাথায় রেখে আপাতত চলা যেতে পারে। কিন্তু টিভি দেখে হেদায়েত হবে এটা নিশ্চিত নয়। হেদায়েত এর জন্য মেহনত জরুরী। তবে হ্যাঁ এর উপকার যে নাই তা নয় বরং আছে তাইতো উলামায়ে কেরাম ফতোয়া দিয়েছেন যে যা বাস্তবে দেখা যায় তা টিভিতেও দেখা যায়। এছাড়া আমার কাছেও ফোন আসে যে আপনার টিভির অমুক শোতে ঐ কথাটার কারণে আমার জীবনের মোড় পরিবর্তন করেছি, ঐ গানটি শুনার পর আমি নামাজ পড়ছি ইত্যাদি।

জীবনধারাঃ যদি কোন চ্যানেল হয় আপনার তাহলে সিনেমা, নাটক ইত্যাদি বাদ দিয়ে লোক আপনার প্রোগ্রাম দেখবে বলে মনে করেন?
জুনাইদ জামশেদঃ অবশ্যই দেখবে। কারণ পাবলিকের অবস্থান বুঝতে হবে আমি এটা তাবলীগে গিয়ে মানুষের সাথে মিশে শিখেছি যে প্রোগ্রাম যদি মানুষকে ছুঁয়ে যায় তবে মানুষ তা দেখবে।কেননা, একজন অভিনেতা তখনই সেরা হয় যখন সে মানুশকে ছুঁতে পারে।

জীবনধারাঃ কষ্টের পরে কেষ্ট মিলে। এখন তো বড় ব্যবসায়ী। কীভাবে হল?
জুনাইদ জামশেদঃ আসলে আমার এক বন্ধু সোহেল। ওর সাথে মিলে আমি এই ‘জে ডট’ খুলি। আলহামদুলিল্লাহ কীভাবে চলছে আল্লাহই জানে। প্রথমে কাপড় বানাই তারপর পাঞ্জাবী ইত্যাদি বানানো শুরু করি। এরপর যখন দেখলাম মেয়েদের কাপড় হাটুর উপর উঠা শুরু করেছে তখন মেয়েদের ড্রেস বানানো শুরু করি।

জীবনধারাঃ ফ্যাশন প্রদর্শনীর ব্যপারে কি বলবেন?
জুনাইদ জামশেদঃ যে পোশাকে মা –বোন আর মেয়েকে দেখা যায় তার প্রদর্শনীও করা যায়। আর যে পোশাকে মা-বোন আর মেয়ে এবং ক্ষেত্র বিশেষে স্ত্রী আপনাকে দেখতে পছন্দ করে তাঁর শো করা যায়। ইসলাম তো অনেক সহজ।

জীবনধারাঃ তাবলীগ করেন আবার ফ্যাশন সচেতনও। কি বলবেন ?
জুনাইদ জামশেদঃ আসলে আমি যখন প্রথম প্রথম তাবলিগ করি তখন আমার গায়ে ফাটা-পুরানো কাপড় ছিল তো তারিক জামিল আমাকে ধমক দিয়ে বললেন যে যাও! ফিটফাট হয়ে আস। ফিটফাট তো আগে থেকেই ছিলাম কিন্তু এই ধারনা চলে এসেছিল যে হয়ত এমনি থাকতে হবে। আসলে হাদিসে এসেছে, আল্লাহ সুন্দর আর সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন। তো এটাইতো দরকার যে মানুষ আমাদের দেখে ফিরে না যায় যে হায়! তাবলীগ করে এই অবস্থা!

জীবনধারাঃ এই বয়সে যারা দ্বীন শিখতে চায় তাদের ব্যাপারে কি বলবেন?
জুনাইদ জামশেদঃ আমি যেভাবে শিখেছি তথা সফর করে।

জীবনধারাঃ আল্লাহর সাথে একান্তে কথা বলেন?
জুনাইদ জামশেদঃ আমিও বলি আর তিনিও বলেন। মানুষের মনে তিনি যে ভাল বিষয়গুলো ঢালেন সেগুলোই আল্লাহর কথা। তবে সম্পর্ক যার যেমন সে বুঝবেও তেমন।

জীবনধারাঃ এখন কি নিয়ে ব্যস্ত?
জুনাইদ জামশেদঃ ব্যবসা, নাত, তাবলীগ আর চ্যারিটি ওয়ার্ক।

জীবনধারাঃ এত বড় ব্যবসা আর তাবলীগ। কীভাবে মেন্টেইন করেন?
জুনাইদ জামশেদঃ আসলে আমার যে বন্ধু আছে সোহেল সেও তাবলীগ করে তাই তাঁর সাথে কথা আছে আমি ব্যবসায় সময় কম দিব। কেননা আমি দুনিয়ার ঝামেলা মুক্ত হতেই গান ছেড়েছি।

জীবনধারাঃ আগেও হিরো ছিলেন আর এখনও হিরো। কি বলবেন?
জুনাইদ জামশেদঃ আসলে আমাকে তারেক জামিল সাহেব একবার বলেছিলেন, জুনাইদ! যখন তুমি এই জগত ছাড়বে তখন দেখবে আল্লাহ তোমাকে কী কী দেয়। আর আমাকে তো আল্লাহ ফোকাসের সম্পদ দিয়েছেন তাই নিয়ত করেছিলাম যে আমাই আল্লাহর হুকুম মেনেই দেখাব। সেই চেষ্টা এখনও চলছে। প্রথম তো কিছুই ছিল না তারপর ‘জালওয়ায়ে জানা’ এ্যালবাম বের করলাম এরপর এই ‘জে ডট’। কীভাবে যে চলছে আল্লাহই ভালো জানে। আল্লাহ আমার মাইকও ফিরিয়ে দিয়েছেন এখন আগের চেয়ে বেশিক্ষণ থাকি মাইকের সামনে। কয়েকদিন আগে মোবাইল কোম্পানি আমাকে বলল যে আমি নাকি শীর্ষ পাঁচে আছি যাদের মোবাইলে বেশী কল আসে।

জীবনধারাঃ আজকাল সামাজিক আন্দোলনও করছেন?
জুনাইদ জামশেদঃ পরিচ্ছন্নতা নিয়ে খানিক কাজ করছি। ইসলামেরও দাবি আর ইনসানিয়াতেরও দাবি।

জীবনধারাঃ বাংলাদেশের ব্যাপারেকি বলবেন?
জুনাইদ জামশেদঃ অনেক সুন্দর একটা দেশ। আমার তো অনেক ভক্ত সেখানে আছে তারা আমার নাত শুনে। মানুষগুলো অনেক নরম স্বভাবের। একেবারে মাটির।

জীবনধারাঃ অনেক অনেক শুকরিয়া।
জুনাইদ জামশেদঃ অনেক শুকরিয়া।

আরো পড়ুন পোস্ট করেছেন

Comments

লোড হচ্ছে...
শেয়ার হয়েছে